উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আয়াতের দ্বিতীয় অংশে একটি চরম সত্য আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করে দেয়া হয়েছে যা মানুষ বুঝতে পারলে পৃথিবীর রং বদলে যাবে। পৃথিবী তার শৃঙ্খলা ফিরে পাবে। সে সত্যটা হলো মৃত্যুর পর তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে, দুনিয়ার সকল কর্মের প্রতি...
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে একটি চরম সত্য আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করে দেয়া হয়েছে যা মানুষ বুঝতে পারলে পৃথিবীর রং বদলে যাবে। পৃথিবী তার শৃঙ্খলা ফিরে পাবে। সে সত্যটা হলো মৃত্যুর পর তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে, দুনিয়ার সকল কর্মের প্রতিদান দেয়া হবে। মৃত্যুর পর পচে গলে নিঃশেষ হবে না। হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরায় সৃষ্টি না হয়ে অন্য কোনো প্রাণীর দেহে আত্মপ্রকাশ করবে, বিষয়টি এমন নয়। সুস্থ বিবেকের কাছে এমন দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! দেখুন আমরা পুনর্জন্মের বিশ্বাস করি। অর্থাৎ আমরা মৃত্যুর পর আবার জন্মগ্রহণ করব। যদি এই দুনিয়াতে ভালো কাজ করে যাই তাহলে ব্রাহ্মণ বা ভালো কিছু হয়ে পুনরায় জন্মগ্রহণ করব। আর যদি পাপ করে থাকি, তাহলে কুকুর বিড়াল বা কীট-পতঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করবো।
আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই! আপনার জেনে রাখা উচিৎ: পুনর্জন্মের মতবাদ বেদের মধ্যে নেই। পরবর্তীতে ‘পুরাণ’ এর মধ্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। পুনর্জন্মের বিশ্বাসে এ কথাই বুঝতে চাই যে, মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্যগুলো পিতা থেকে পুত্র এবং পুত্র থেকে তার পুত্রের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে থাকে। মূলত পুনর্জন্মের মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে, এক শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য। মহান আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টির পর তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখেননি। অভিশপ্ত শয়তান প্রথমে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের মধ্যে উঁঁচু-নিচু ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। ধর্মের নামে দলিত ও নিজ সম্প্রদায় ‘শূদ্রদের সেবা গ্রহণকারী ও তাদেরকে নিচু জাত সাব্যস্তকারী’ ধর্মের ঠিকাদারদের কাছে যখন তারা জানতে চাইলেন, আমাদের সৃষ্টিকর্তা একজন, তিনি যেহেতু নাক, কান, চোখ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আমাদেরকে একই রকম বানিয়েছেন, তাহলে আপনারা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ এবং আমাদেরকে নিচুজাত বানালেন কেন? ধর্ম ব্যবসায়ীরা তখন নিজেদের স্বার্থরক্ষার তাগিদে পুনর্জন্মের দোহাই দিয়ে এই ফর্মূলা বাতলে দিলেন যে, ‘পূর্বের জীবনের কর্মফলই তোমাদেরকে নিচু বানিয়ে দিয়েছে।’ তখন থেকে এই মতবাদের জন্ম হয়। এই মতবাদের দৃষ্টিতে সমস্ত আত্মা পুনঃসৃষ্টি হয়ে কর্মফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আকৃতি ধারণ করে আবার পৃৃথিবীতে আত্মপ্রকাশ করে, মারাত্মক অন্যায়কারীরা উদ্ভিদ (বনস্পতির) রূপে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং সৎকর্মশীলরা পুনর্জন্মের চক্র থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়।
পুনর্জন্ম মতবাদের বিরুদ্ধে তিনটি প্রমাণ
১.পুনর্জন্মের অসারতা প্রমাণে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলোÑ পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের তথ্যমতে, ভূপৃষ্ঠে সবার আগে সৃষ্টি হয়েছে উদ্ভিদ। এরপর জীব-জন্তু। তার আরো লক্ষ-কোটি বছর পর মানুষের অস্তিত্ব। তখন পর্যন্তযেহেতু মানুষের জন্মই হয়নি, কোনো আত্মা পাপ কর্ম করেনি, তাহলে কোন আত্মা ওই সব উদ্ভিদ এবং জীব-জন্তুরূপে সৃষ্টি হয়েছে?
২. পুনর্জন্মের মতবাদ বিশ্বাস করলে আবশ্যিকভাবে একথাও মানতে হবে যে, ভূপৃষ্ঠের প্রাণীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। কারণ, যে সব আত্মা পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পেয়েছে-সেই পরিমাণ প্রাণীর সংখ্যাও হ্রাস পাওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত পৃথিবীর মানুষ, জীব-জন্তু এবং উদ্ভিদ এর সংখ্যা অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েই চলছে।
৩. পৃথিবীতে জন্মগ্রহণকারী ও মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যায় আসমান-জমিন ফারাক। মৃত্যুবরণকারী মানুষের তুলনায় জন্মগ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। কখনো কখনো লক্ষ-কোটি মশা-মাছি জন্মলাভ করে, অথচ বাস্তবে মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা হয় অনেক কম। তাহলে এতসব মশা-মাছি কার আত্মার রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসে?
শিশুদের সম্পর্কে অনেক সময় শোনা যায় যে, পূর্বজন্মে যেখানে সে বসবাস করতো সেই জায়গা সে চিনতে পারছে, তার পূর্বের নাম বলে দিচ্ছে এবং পুনর্জন্মের কথা বলে দিচ্ছে; এগুলো শয়তান ও ভূত-প্রেতের কারসাজি। মানুষের দ্বীন-ঈমান ধ্বংস করার জন্য এরা শিশুর মাথায় প্রবেশ করে আবোল তাবোল কথা বলে। মরণের পর মানুষ প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরে যায় এবং দুনিয়ার কর্মফল হিসেবে শাস্তি বা পুরস্কার লাভ করে; এই প্রকৃত সত্যটি মৃত্যুর পর সবার সামনেই উন্মোচিত হবে।
কর্মের প্রতিদান মিলবে
যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে ও সৎপথে চলে, সে জান্নাতে (স্বর্গে) যাবে। জান্নাত হলো এমন পবিত্রতম স্থান, যেখানে আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা বিদ্যমান। বিলাসিতা এবং বিনোদনের এমন সব উপকরণ সেখানে আছে, ‘যা দুনিয়ায় কোনো চক্ষু অবলোকন করেনি, কারো কর্ণ শোনেনি এবং কারো অন্তরে সে সবের কল্পনাও করেনি। স্বর্গ তথা জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে স্বচক্ষে মহান মালিকের দর্শন’। এর চেয়ে আনন্দের এবং খুশির আর কিছুই হতে পারে না।
আর যারা মন্দকর্ম করে, অসৎপথে চলে এবং মালিকের নির্দেশ অমান্য করে তারা জাহান্নামে যাবে। অনন্তআগুনে জ্বলবে। সব পাপাচারের শাস্তি তাকে দেয়া হবে। সবচেয়ে বড় শাস্তি হবে মহান মালিকের প্রিয় দর্শন থেকে বঞ্চিত হওয়া। তারা মালিকের কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।
জান্নাত-জাহান্নাম তো দেখা যায় না। তাহলে মৃত্যুর পর জান্নাত বা জাহান্নামের ব্যাপারে বিশ্বাস করবো কিভাবে?
এ সম্পর্কে আমাদের এতটুকু জেনে রাখা দরকার যে, সকল ধর্মগ্রন্থেই স্বর্গ-নরকের আলোচনা স্থান পেয়েছে। যদ্বারা প্রমাণ হয়, স্বর্গ-নরক তথা জান্নাত-জাহান্নামের বাস্তবতা সকল ধর্মালম্বীদের মতে স্বীকৃত।
একটি উদাহরণের মাধ্যমেও আমরা জান্নাত-জাহান্নামের বাস্তবতা বুঝতে পারি। বাচ্চা যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন যদি তাকে বলা হয় তুমি গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে দুধপান করবে, হাসবে, কাঁদবে, অনেক জিনিস দেখতে পাবে, গর্ভ অবস্থায় সে এগুলো বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু যখনই ভূমিষ্ঠ হয়ে বাইরের আলোতে চোখ মেলবে, তখন তার সব কথা বিশ্বাস হবে। এমনিভাবে পৃথিবীটা মায়ের গর্ভের মতো। মৃত্যুর পরে যখন আখেরাতের আলোতে চোখ মেলবে, তখন সবকিছু তার বুঝে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো পরকালের জীবনে জান্নাত-জাহান্নাম, পুলসিরাত-মিযান প্রভৃতি সম্পর্কেও সত্যবাদী মহাপুরুষ সংবাদ দিয়েছেন, প্রাণের শত্রুও যাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যা দিতে পারে না এবং সেই কুরআন আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছে, যার সততা সম্পর্কে পৃথিবীর কোনো মানুষের সামান্যতম সন্দেহ নেই।