মাওলানা সাইফ সিরাজ। (সাইফ সিরাজ)
প্রভাষক আরবি ভাষা ও সাহিত্য।
দারুল উলুম আলিয়া। কেন্দুয়া-নেত্রকোনা
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যৌথজীবন শুরু। ফসল, এক কন্যা ও এক ছেলে (আপাতত)।
———–
তিনি মূলত একজন কবি। জাতির বিবেক। উম্মাহর কন্ঠস্বর।
.
তার ছোট গল্পের হাতও চমৎকার।
.
তার উপন্যাসে পাই মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মসৃণ পাঠ।
.
তিনি একজন দরদী শিল্পী। অন্তর্ভেদী চিন্তক। ভাবুক প্রকৃতির লেখক।
.
মাদরাসা জীবনের প্রতি একটা গোপন ভালোবাসা তার কথায় ও লেখায় চুইয়ে চুইয়ে পড়ে।
.
তিনি একজন আদর্শবান মানুষ। সোজা পথেই সব সময় হাঁটেন। যদিও তার বাঁকা পথে চলার সুযোগ ছিল আছে।
.
তাহলে শুরু হোক: সিরাজীনামা!
১. লেখালেখির সূচনা কবে থেকে?
= তিনটা সূচনা ধরতে হয়। ১৯৯২ সালে প্রথম কবিতা লেখার চেষ্টা (‘সাধু’ শিরোনামে) । তারপর বানান ভুলের আধিক্য আর স্যারের হাসাহাসিতে লেখালেখি বন্ধ ‘৯৬ পর্যন্ত। এই সময়ে আবার মাদরাসার দেয়াল পত্রিকার জন্য শুরু। চলে টানা ২০০৫ পর্যন্ত। আবার বন্ধ হয় সারভাইভ করার জন্য। ২০০৯ থেকে সাইফ সিরাজ নামে নতুন করে শুরু করে এখন পর্যন্ত লিখছি…
.
২. নিয়মিত লেখালেখি করেন?
= না। ভেতর থেকে তাগিদ বা ভাব আসার জন্য অপেক্ষা করি।
.
৩. লেখালেখির ক্ষেত্রে কার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়েছেন?
= এই প্রশ্নের উত্তরটা আমার জন্য খুবই বিব্রতকর। সময়ের আবর্তনে নানা জনের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি। তবুও যাদের কথা বলতেই হবে; সামগ্রিক উৎসাহটা এসেছে উস্তাজ লাবীব আব্দুল্লাহ দা. বা. থেকে। গল্পের জন্য এককভাবে রোকন রাইয়ান। কবিতার জন্য আমার আলিম শ্রেনির বাংলার প্রভাষক সিদ্দিকুর রহমান রতন স্যার।
.
৪. লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার প্রেরণা ও আদর্শ কে?
= প্রেরণাটা বাবা একিউএম সিরাজুল ইসলাম। আদর্শ হিসেবে আছেন শ্রদ্ধেয় শরীফ মুহাম্মদ, ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী, নসীম আরাফাত ও আবু হাসান শাহরিয়ার।
.
৫. প্রিয় বই?
= ০১. মা যা খাসিরাল আলমি বিনহিতাতিল মুসলিমীন ও শামায়েলে তিরমিজি।
.
০২. সীমান্ত ঈগল। মৃত্যুক্ষুধা। সোনালি কাবিন।
.
৬. প্রিয় লেখক?
= আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী, নসীম হিজাজী, ফ্রানৎস কাফকা, আল মাহমুদ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
.
৭. প্রিয় মুহূর্ত?
= বা’দ আসর থেকে মাগরিব।
.
৮. কোন সময় লিখতে ভালোবাসেন?
= রাত দশটার পর। চাপ থাকলে যে কোন সময়।
.
৯. প্রিয় স্থান?
= ময়মনসিংহ।
.
১০. প্রিয় পর্যটন স্থান?
= মদীনাতুন্নবী। (স্বপ্ন দেখি। যেতে পারি না পারি- এইটাই আমার প্রিয় পর্যটন স্থান।)
.
১১. স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
= উম্মাহ ও উলামার ঐক্য। মানুষের ধর্ম ও নৈতিক মূল্যবোধ শাণিত করার রাজনীতির সূচনা। দাওয়াহর জন্য শিল্প-সাহিত্য; এই বোধে তরুণদের উজ্জীবিত করা।
.
১২. প্রিয় রং
= যে কোন হালকা রঙ। তবে সবুজ ও নীলের প্রতি পক্ষপাত আছে।
.
১৩. প্রিয় পাখি?
= বাবুই ও টিয়া
.
১৪. প্রিয় ফুল?
= চন্দ্রমল্লিকা
.
১৫. প্রিয় খাবার?
= টাকি মাছের ভর্তা, গরুর গোশতের ভূনা ও সাদা ভাত।
.
১৬. প্রিয় কবি?
= শেখ সাদী, আল্লামা ইকবাল, জীবনানন্দ দাশ।
.
১৭. প্রিয় কাজ?
= কুরআন শেখানো।
.
১৮. সর্বাধিক পঠিত বই?
= সীমান্ত ঈগল।
.
১৯. প্রিয় মাদরাসা?
= আমার পড়ার মধ্যে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম কমলপুর, ভৈরব। পড়তে স্বপ্ন দেখতাম চট্টগ্রামের দারুল মা‘আরিফ।
.
২০. প্রিয় মানুষ?
= আব্বা একিউএম সিরাজুল ইসলাম।
.
২১. প্রিয় ব্যক্তিত্ব?
= সবসময় সবকালে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সমকালে মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ হাফিজাল্লাহ।
.
২২. প্রিয় ফেসবুক লেখক?
= নুরুজ্জামান নাহিদ ও সাব্বির জাদিদ।
.
২৩. প্রথম লেখা প্রকাশ? কবে কোথায়?
= আদর্শ নারী। ২০০১ জুন।
.
২৪. এখন কী পড়ছেন?
= আহমদ মোস্তফা কামালের বাংলা গল্পের উত্তরাধিকার। মুহাম্মদ আসাদের রোড টু মক্কা।
.
২৫. এখন কী লিখছেন?
= ‘মনোলগ সভ্যতা’ ও ‘মায়া কায়া অথবা মৃত্যু ছায়া’ নামে দু’টো গল্প। ‘যে তুমি আমার আলোর মিনার’ নামে সীরাতের সিরিজ কাব্য।
.
২৬. কোন বইটি পড়ে সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন?
= শরীফ মুহাম্মাদের ‘সবুজ গম্বুজের ছায়া’, ‘কিমিয়ায়ে সাআদাত’ এবং নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’।
.
২৭. কোন বইয়ের ছেলে চরিত্রকে দেখে মনে হয়েছে- ইস! আমি যদি এমন হতাম!
= প্রথম দিকে সাইমুম সিরিজের আহমদ মুসা পরে সীমান্ত ঈগলের বদর বিন মুগীরা।
.
২৮. কোন বইয়ের কোন মেয়ে চরিত্রকে দেখে মনে হয়েছে- ইস, আমার যদি এমন কেউ হত!!
= ফরাজী জুলফিকার হায়দার লিখিত ‘হাসিম সালমার প্রেম ফসল’-এর সালমা।
.
২৯. জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি?
= পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে দর্জির কাজে লেগে যাওয়ার পর পুনরায় যেদিন পড়াশুনায় ফিরেছিলাম।
.
৩০. জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কী?
= আনন্দ মোহন কলেজে পড়ি। তখন থার্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। থাকি তরুণ হলের তের নম্বর রুমে। পরের দিন ‘ইনট্রোডাকশন টু ফিলোসৌফি’ পরীক্ষা। দ্রুত রিভিশন দিচ্ছি। রাত দশটা। হঠাৎ পুরো হলে ঘেরাও দিল র্যাব। প্রত্যেকের আইডি কার্ড চেক করছে। আমার আইডি কার্ডে লেখা সাইফুল হক। ওরা খুঁজছে সাইফকে। আমার হলমেটরা সবাই বলো সাইফ নামে কেউ হলে থাকে না। প্রায় দশজনকে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই হল সুপার এসে আমাকে নিয়েই অফিসে গেলেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যার গেলেন। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন:
-“আমার কলেজের ছাত্র গ্রেফতারের আগে কেন আমার অনুমতি নেননি?”
অফিসার কিছুটা লজ্জিত হয়ে সবাইকে ছেড়ে দিলেন। আমার ব্যাপারটা জানতে চাইলেন স্যার। তারা জানাল:
-কেউ একজন তাদের অভিযোগ বক্সে চিরকুট দিয়েছে- তেষট্টি জেলায় একযোগে বোমা হামলায় আমি জড়িত।
পরে অভিযোগকারী বামপন্থী ছাত্রনেতা অনেকদিন পরে ক্ষমা চেয়েছিল। আমার জীবনে এই পরীক্ষাটাতেই পঞ্চাশের নিচে নম্বর পাই।
.
৩১. জীবনের সবচেয়ে মজার ঘটনা কোনটা?
= ময়মনসিংহে ছিনতাইকারিরা আমার সব নিয়ে চলে যাচ্ছে… এমন সময় কী ভেবে যেন আমি বললাম, ” পীর বংশের পুলার লগে পুংডামি করলি শেষ অইয়া যাইবি।” এই কথা শুনে ওরা মোবাইল, টাকা ও আমার সাইকেল ফেলে দৌড়ে পালাল। আমি ধড়ফড়ানো বুকে দ্রুত মেসের পথ ধরলাম। হা হা হা।
.
৩২. জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা?।
= ১৯৯৭ সালে এপেন্ডিসাইটিসের অপারেশনের পরে নানা শারিরীক ও পারিবারিক সমস্যায় কওমীতে ফিরতে পারিনি। তাকমীল পড়া হয়নি। আমার জীবনের সবচেয়ে দু:খের অধ্যায়।
.
৩৩. দৈনিক কুরআন তেলাওয়াত করা হয়?
= মাঝে মাঝে গ্যাপ পড়ে যায়।
.
৩৪. তাহাজ্জুদ আদায় করা হয়?
= অনিয়মিত।
.
৩৫. জীবনের লক্ষ্য কী?
= একটা সফল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখি। আবার ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সফল পিতা হওয়ার স্বপ্নও দেখি।
.
৩৬. শখ কী?
= ক্যালিগ্রাফী। ননমিউজিক্যাল নাশীদ শোনা। শিশুদের পোশাকের ডিজাইন করা। বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক আড্ডা।
.
৩৭. এই যে লেখালেখি, এ নিয়ে জীবনের সমাপ্তি বেলায় কী দেখতে চান?
= সবচেয়ে বড় কথা নাজাতের উসিলা হিসেবে দেখতে চাই। আরো দেখতে চাই চিন্তশীল ও বুদ্ধিমান মানুষ আমার লেখার সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ ভাবনাকে ইসলামের সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ ভাবনাই বলবে। বলবে সাইফ সিরাজ প্রকারান্তরে ইসলামের কথাই প্রকাশ করেছে।
.
৩৮. কোন ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন এবং কেন করেন?
= ইতিহাস, দর্শন, তাফসীর ও সাহিত্য সমালোচনা।
ইতিহাস আমাকে শাণিত করে। খুলে দেয় অগণিত চোখ।
দর্শন আমাকে চারপাশে থাকা ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে ধৈর্য নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক করে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করে।
তাফসীর পাঠে আমি সবসময় নিজের ঈমানকে মজবুত করি। তাফসীরের পাঠ মিম্বরে আমাকে সহজ ও সাবলীল রাখে। বক্তব্যকে সমৃদ্ধ করে।
সাহিত্য সমালোচনা আমাকে আমার লেখা নিয়ে প্রতিনিয়ত নিরীক্ষা করতে ও নিজেকে পাঠকের চোখে দেখতে সাহায্য করে।
.
৩৯. আমাদের নবী ছাড়া কোন নবীকে বেশি ভাল লাগে? কেন?
= মূসা আলাইহিস সালাম। কারণ, বনি ইসরাইলের মত বিটলা একটা জাতিকে নিয়ে তিনি যে সংগ্রাম করেছেন সেটা আমাকে টানে।
.
৪০. কোন সাহাবীকে বেশি ভাল লাগে? কেন?
= হযরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু। আল্লাহ্র রাসূল নিজে তার ঈমানের জন্য দুয়া করেছেন। নদের নামে চিঠি লেখার মত রোমান্টিক একটা ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “ফোরাতের তীরে যদি একটি কুকুর না খেয়ে মারা যায় তাহলে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।” আরো নানা ঘটনা যা তাঁকে আলাদা করে প্রিয় করে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এছাড়াও শিয়াদের অপবাদের জুলুমের জন্যও তিনি আমার প্রিয়।
.
৪১. কোন তাবেয়ীকে বেশি ভাল লাগে? কেন?
= নুমান ইবনে সাবিত তথা ইমাম আযম আবু হানিফা রাহ. কে ভাল লাগে। তাঁর কাজ, শ্রম, উম্মাহর দরদ, আমল এসবের নিরীখেই তাঁকে ভাল লাগে।
.
৪২. কোন ইমামকে বেশি ভালো লাগে ? কেন?
= ইমাম আবু ইউসূফ রাহ.কে ভাল লাগে। কেন ভাল লাগে তা কখনোই ভাবিনি।
.
৪৩. কোন বুযুর্গকে বেশি ভালো লাগে? কেন?
= হযরত শাহজালাল রাহ.কে। গৌর গোবিন্দের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ। ইসলামের প্রচার। একজন মজলুম মুসলিম বুরহানুদ্দীনের প্রতি কৃত জুলুমের প্রতিরোধে সুদূর ইয়েমেনের একজন মানুষ যে দক্ষতা দেখিয়েছেন; এককথায় অসাধারণ এবং বিমোহিত হওয়ার মতো।
.
৪৪. আমাদের আকাবিরদের মধ্যে কাকে বেশি ভালো লাগে? কেন?
= হোসাইন আহমদ মদনী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর ও শামসুল হুদা পাঁচবাগী রাহিমাহুমুল্লাহ। তাঁদের ইলম, আমল, প্রজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ চিন্তার জন্য চারজনকেই আমার খুব ভাল লাগে।
.
৪৫. কোন বীর মুজাহিদকে বেশি ভালো লাগে? কেন?
= গাজী সালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহ. তাঁর জোশ ও হুশের সমন্বয় এবং মুসলিমদের জন্য চরম একটা অস্থির সময়ে তিনি যে নেতৃত্ব ও যুদ্ধকৌশল নিয়েছিলেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আমি অবাক হয়ে ইতিহাসের গ্রন্থে তাঁর অধ্যায়টা পড়ি। আইয়ূবীর প্রতিটি পদক্ষেপকে আমার কাছে অতিমানবীয় তথা এলহাম মনে হয়।
.
আমাদেরকে কষ্ট করে সময় দেয়া জন্যে আপনাকে অনেক কৃতজ্ঞতা ও জাযাকাল্লাহ
-আপনাদেরকেও।
.
আমরা যারা এ-আয়োজনে ছিলাম
Raihan Khairullah
Nuruzzaman Nahid
Arif Khan Sa’ad
nayonptk
খুতবাহ টিভি প্ল্যাটফর্মের লেখক ও গবেষক। সহীহ আকিদা ও সুন্নাহভিত্তিক দ্বীনি শিক্ষাদানে নিয়োজিত।
লেখকের সকল প্রবন্ধ দেখুনপাঠকের মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত জানান।